1. webprominhaz@gmail.com : Admin :
  2. Aktar@gmail.com : AKTAR hosen : AKTAR hosen
  3. amirbinsultan95@gmail.com : Amirbin Sultan : Amirbin Sultan
বিজ্ঞপ্তি :
  • পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
শিরোনাম :
কক্সবাজার জেলার কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মনোনীত হলেন পুসাহ’র উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত | দৈনিক জাগ্রত বিবেক ঢাকাস্থ বরুড়া উপজেলা জনকল্যাণ সমিতির ১ লাখ টাকা অনুদান তাকওয়া ফাউন্ডেশন বরুড়া উপজেলা শাখার লাশ দাফন টিম ২ এর ৩৫ তম গোসল কাফন জানাজা দাফন সম্পন্ন। আত্মপরিচয় ও আমাদের হীনমন্যতা | মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীন টর্নেডো ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা ওরাই আপনজন সংগঠন | দৈনিক জাগ্রত বিবেক সমাজ সংস্কার-৩য় পর্ব | আব্দুল আজিজ অপসংস্কৃতি রোধে চাই সম্মিলিত প্রয়াস: মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন | জাগ্রত বিবেক কী পড়বো? তোফায়েল গাজালি | জাগ্রত বিবেক কৃতিত্বের মানদণ্ডে শেখা না কি শেখানো: রমিজ উদ্দিন

আত্মপরিচয় ও আমাদের হীনমন্যতা | মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীন

  • আপডেট টাইম : Monday, July 5, 2021
  • 100 বার পড়া হয়েছে
১.
বাবা মুচির কাজ করে। রাস্তার ধারে চৌকি পেতে বসে জুতো সেলাই করে। এ মুচির মেয়ে পড়ছে স্কুলে। স্কুল ছুটির পর বাবার পাশ দিয়ে যেতেই বাবা ডাক দেয়, ‘অ-চুমকি! একটু বস তো মা, আমি একটু খাইয়া আহি, সকাল থেইকা খাইবার পারিনাই। কেউ জুতা সেন্ডল লইয়া কেহ আইলে দারাতে কইস। আমি তারাতারি আইমুনে। কেমুন!’
আমি হতভম্ব হয়ে তাদের অগোচরে দাঁড়িয়ে দেখলাম এবং বাপ মায়ের কথোপকথন শুনলাম। রঙের বাক্সের উপর বইগুলো রেখে স্কুল ড্রেস পরা মেয়ে বাবার আসনে দ্বিধাহীন চিত্তে বসে পড়েছে।
২.
বাবা সবজি বিক্রি করে। সবজি বিক্রেতা বাবার ছেলে কলেজে পড়ে। ছুটির দিনে বেচাবিক্রি বেশি বলেই কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে ক্যাশে বসিয়ে দিলো বাবা। ছুটির দিন সবাই যখন ঘুরাঘুরি, মাস্তি এবং চ্যাটিং ডেটিং এ ব্যস্ত- বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে সরকারি কলেজে অধ্যায়নরত তীক্ষ্ণ মেধাবী এ ছেলেটি তখন বাবার দোকানে বসে বরবটি, শিম, ঢেড়শ, আলু কাঁচামরিচ এসব তরিতরকারি ওজন করতে করতে টাকা গুণে গুণে ক্যাশে ভরছে।
৩.
বাবা কৃষক। কাঠফাটা রোদ ও ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফসল ফলায়। কড়া রোদ বিলানো সূর্যের তাপে সেদ্ধ হতে হতে গা থেকে অপরিমেয় ঘাম নির্গত হয়। শরীরের সাদা রক্তের মতো ঝরে পড়া সেই ঘাম, গায়ে লেপ্টে থাকা শার্ট শুষে নেয়। দক্ষিণ দিক থেকে আসা এক ঝাপটা ঠাণ্ডা বাতাস যখন ঘামে ভেজা শার্টে লাগে সেটা বিজয়ী নিশানার ন্যায় পতপত করে উড়তে থাকে তখন। ভেজা শার্টের স্পর্শ ও দক্ষিণা হাওয়া কাঠফাটা রোদে কর্মরত কৃষকের শরীর কলাগাছের ন্যায় শীতল হয়ে যায়।
এমন কৃষকের ছেলে পড়ে চুয়েটে। ইঞ্জিনিয়ার হবে বছর দু’য়েক পরে। সেই ছেলেও যখন ছুটিতে গ্রামে আসে, পরনের লুঙি উল্টো করে গোছ তুলে বাবার সাথে কৃষি কাজে নেমে পড়ে। ধানের ভার বহন করে। মাটির ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বাবার পায়ের চাপে পা ফেলে দৌড়ে। চুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছেলেটির বাবা যে কৃষক এবং ছুটিতে সে নিজেইও বাবার সাথে কৃষি কাজ করে তাতে তার কোনো অভিযোগ নেই। নেই কিঞ্চিত দ্বিধাও। বাবার কাজকে কেবল স্যালুট করে না, বরং নিজেও অংশ গ্রহণ করে উপভোগ করে। এবং গর্ববোধ করে কৃষক বাবাকে নিয়ে।
৪.
সেদিন একটি ছবি খুব ভাইরাল হয়েছিল। নামকরা সেলিব্রেটিরাও সেই ছবি সানন্দে শেয়ার করে প্রশংসায় ভাসিয়েছে। ছবিটা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থীর। গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা ছেলেটি করোনাকালে সবজির দোকান খুলে বসেছিল গ্রামে। বেকার থাকার চেয়ে এমন উদ্যোগী কাজ করায় কে না তার প্রশংসা না করে থাকবে!
এবার আসুন বিপরীত কিছু চিত্র তুলে ধরি।
১.
বাবা ওঝার কাজ করে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের ভাঙাচোরা ঘর সংস্কার করে পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য টাকা জোগাড় করে। দৈনিক মজুরিতে সারাদিন পরের ঘরে হাতুড়ি পেটায়। সারাদিন খাটুনি করে সংসারের গাড়িতে কোনোমতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর তার ছেলে ভুঁড়িওয়ালা একটা পেট ও সমৃদ্ধ মাংসলওয়ালা বাহু নিয়ে মোটরবাইকে চেপে বসে, মুখে কালো চশমা লাগিয়ে স্কুল কিংবা বালিকা মাদ্রাসার চারপাশে চারপাশে ঘুরঘুর করে। ছুটি পরবর্তী ছাত্রীদের পেছনে ছুটে। এই যে মোটরসাইকেল নিয়ে নিজের আভিজাত্য প্রকাশ করছে-  এ মোটরবাইক কিন্তু তার নয়, তার উর্ধ্বোতম নেতার।, সারাক্ষণ যার চামচামি করে।
২.
বাবা রিকশা চালায়। শরীরের ঘামে কাপড় ভিজে, সেই ঘাম কর্তিত শরীর থেকে টপটপ করে ঝরে পড়া রক্তের মতন মাটি ছুঁয়ে। মানুষের শরীরের লাল রক্ত মাটিতে পড়লে তার ছাপ দীর্ঘ সময় থাকে, আর কষ্টের ভারে বের হওয়া শরীরে ঘাম তেমনই ন দৃশ্যমান হয় না। এমন ঘাম ঝরানো রিকশাওয়ালা বাবার ছেলে রাজনীতি করে, চাঁদাবাজি করে, মাস্তানি করে, প্রেম করে, ডেটিং করে, রাতভর চ্যাটিং করে, বোতল খায়। আরও কত কি করে!
এসবের চেয়ে কঠিন সত্য কি জানেন? বাবা রিকশাওয়ালা এ পরিচয় দিতে মাস্তান ছেলের লজ্জা করে, আত্মসম্মানে ভাটা পড়বে বলে আশঙ্কা করে বাবাকে শসায়। বাবার কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসে আর ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে।
৩.
বাবা ভাতের হোটেল করে। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মেয়ে এতো সেলিব্রেটি, এতো সৌসাল ওয়ার্কিং করে, এতো আত্মসম্মান চিনে- যার ফলে বাবা ভাতের হোটেল করে এমন পরিচয় দিতে তার মন সায় দেয় না। অনেক সময় বাবার সামনে দিয়ে নির্বিকার ভঙিতে হেঁটে চলে কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে বাবাকে বলতে পারে না – ‘আব্বা, আসসালামু আলাইকুম।’
বাবা তার এমন উচ্চ শিক্ষিত মেয়েকে নিয়ে কতো গর্ববোধ করে! প্রসঙ্গ টেনে উচ্ছ্বসিত চিত্তে, মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে মানুষকে বলে- ‘আমার একটা মাত্র মাইয়া, হেতি ভার্সিটিতে হড়ে। গরিব মাইনসে জইন্য বেবাক কাজ করে। কিন্তু মেয়েকে দেখিয়ে এসব কথা বলবে এবং তৃপ্তির ঢেকুর তুলবে, এমন সুযোগও তার নেই। কারণ যাত্রাকালে বাবার দিকে এক ফলক তাকাতেও লজ্জাবোধ করে মেয়েটা।
বাবার আবদারে মেয়ে বলে, ‘না, এ অসম্ভব। আমার একটি স্টাটাস আছে না! সামাজিক স্টাটাস। বাবা ভাতের হোটেল করে এ পরিচয় আমার মাননসই স্টাটাসের পক্ষে অমর্যাদাকর।’
৪.
ছোটকালে বাবা মারা গেছে। ছেলেকে কষ্ট করে বড় করেছে মা। এখন মায়ের ডানে বাঁয়ে কেউ নেই। আছে কেবল সন্তান। যাকে অন্ধের ষষ্ঠী বলে। সন্তান ছাড়া মায়ের পায়ের তলায় মাটি নেই। মা পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে কিংবা পরের খেত- খামারে স্বল্প মজুরিতে ঘামঝরা পরিশ্রম করে। ঈদে-চাঁদে যাকাত ফিতরার জন্য মানুষের দ্বারে-দ্বারে ঘুরে বেড়ায়।
এমন মায়ের ছেলেটা করে রাজার নীতি। মায়ের পরিচয় দেবে তো দূরে কথা, ভালো করে খবর পর্যন্ত রাখে না। উপরতলার নেতাদের চামচামি করে। নেতার ঘরের বাজার সদায় করে। এমন চেংড়া পোলাপান অমুক মা বাবার সন্তান- এমন পরিচয়ের চেয়ে অমুক নেতা-নেত্রির একনিষ্ঠ কর্মী- এমন পরিচয়ে গর্ববোধ করে বেশি।
বলছিলাম আত্মপরিচয়ের কথা। উপর্যুক্ত প্রত্যেকটি ঘটনা সত্য ও সমাজে দৃশ্যমান। ক্ষণেক্ষণে এসব দৃশ্য উপলব্ধি করেছি, দেখেছি, শুনে আসছি। সময়ের ভিন্নতা থাকলেও আমাদের সমাজে এসব ঘটনা যে সত্য তাতে সন্দেহ নেই। এমন দৃশ্য অগণিত। ঘটছে অহরহ।
এসব প্রজন্মের একটা অংশ নিজেরাই শিক্ষিত ও স্বনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও আত্মপরিচয় দিতে দ্বিধা করে না। এমনকি বাবা মায়ের কাজে সহযোগিতার করতে আটঘাট বেঁধে নেমে পড়ে। এতে তাদের আত্মসম্মানে ভাটা পড়ে না বরং আত্মমর্যাদা আরো ফুলে উঠে। আকাশ ছুঁয়ে তাদের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা। বাবা মা ও পরিবারের এসব পরিচয়ে তারাই গর্ববোধ করে, যাদের মানসিকতা বৃহদাকার।
আর যাদের অবস্থান নিম্নে, অবস্থানের চেয়ে ঢের নিচে তাদের মানসিকতা, নিতান্ত অল্প তাদের যোগ্যতা- তারাই আত্মপরিচয় দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। আমার বাবা কৃষক, আমার বাবা রিকশাওয়ালা, আমার বাবা মুচি, আমার বাবা জেলে- এমন পরিচয় গর্বের বৈকি!
আমার যদি জন্ম না হতো আমি নেতা হতাম কী করে। আমার মুচি কিংবা জেলে কিংবা রিকশাওয়ালা বাবার অসংখ্য শুক্রাণুর একটি থেকে যদি আমার শরীরের অস্তিত্ব না গড়তো আমি সেলিব্রিটি হতাম কীভাবে। আমার অশিক্ষিত, গৃহিণী, পরের বাড়িতে কাজ করা মায়ের পেটে যদি আল্লাহ তা’য়ালা আমার অবস্থান না গড়তো আজ আমি বিসিএস ক্যাডার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার ডক্টর হতাম কী উপায়ে।
আমি তো নেতা হয়ে, সেলিব্রেটি হয়ে কিংবা উপযুক্ত যোগ্যতা নিয়ে জন্ম নিই নাই। আমার কৃষক কিংবা রিকশাওয়ালা কিংবা মুচি বাবা আমাকে লালনপালন করেছেন, মা-বাবা বড় করেছেন। শিক্ষিত বানিয়েছেন। অশিক্ষিত, গৃহিণী মায়ের বুকের দুধ খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছে। সুতরাং যোগ্যতার তলায় কেন বাবা মায়ের পেশা পিষ্ট হবে? কেন বৃদ্ধাশ্রমে তাদের অবস্থান হবে? এ কেবল আমার আপনার সুস্থ মানসিকতা এবং জাগ্রত বিবেকের অভাবের ফসল।
আসুন বাবা মায়ের পেশাকে স্যালুট করি। নিজেদের অর্জনের কারণে যেন জন্মদাতা বাবা মায়ের পরিচয় বর্জন না করি।
লেখক : মুহাম্মদ রমিজ উদ্দিন

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Amir Hossen
Customized BY NewsTheme